সুখ দর্শন | সুখের অনুসন্ধান | সুখের দার্শনিক তত্ত্ব | সুখ কি?


সুখ শুধু একটি শব্দ নয়, এটি একটি অনুভব নাম। এই সুখের অর্থ কি সব সময় এক রকম থাকেনা। কেউ সুখ খুঁজে পায় অর্থে, কেউ খুঁজে পায় ভালোবাসায়, কেউ পায় আবার নিঃসঙ্গ নীরবতায়। অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে আজকের মনোবিজ্ঞান পর্যন্ত, মানুষ সুখের ব্যাখ্যায় মগ্ন থেকেছে চিরকাল। সত্যিই কি সুখ ধরা দেয়? নাকি এটি শুধুই এক অনুসন্ধান, যার শেষ নেই?

হিউম্যান ফিলোর আজকের লেখায় আমরা অনুসন্ধান করব--- সুখ কী? মানুষ কেন সুখী হতে চায়? এবং সুখ কোথায় খুজে পাওয়া যাবে? দর্শন, ধর্ম, মনস্তত্ত্ব ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে খোঁজার চেষ্টা করব সুখের দার্শনিক তত্ত্ব। হয়তো এতে আপনি নিজের সুখকে খুঁজে পেতে পারেন নতুন চোখে।

সুখ তত্ত্ব, কারা সুখি? | অভাব-বাসনা কি অনন্ত?

❝মোরা সুখের লাগি চাহি প্রেম, প্রেম মিলেনা❞

রবীন্দ্রনাথ সুখ নিয়ে ভেবেছেন এবং আপনারা জানেন যে সুখ কেন্দ্রিক একটি দর্শন ধারায় গড়ে উঠেছে যে দর্শন ধারাতে সুখ বিশ্লেষণ করা হয়। বার্টান্ড রাসেলর দর্শনধারায় আপনারা সুখ নিয়ে অনেক কথাবার্তা পাবেন। সুখ মানে কি? তাত্ত্বিক ভাবে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। পৃথিবীতে কি সুখী হওয়া সম্ভব? আমার মনে হয় সম্ভব না! কারণ সুখেৱ সঙ্গে সঙ্গে বাসনার বিষয়টি সামনে চলে আসে। বাসনা ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব থাকেনা। আর বাসনার সঙ্গে আরেকটি শব্দ আছে সেটা হচ্ছে অভাব। অথনীতির ভাষায় অভাব মানে হচ্ছে  অনন্ত বাসনা। অভাবের সংঙ্গায় বলা হয়েছে যে- আমি স্কুল কলেজে লেভেলে পড়ে এসেছি; অভাব হচ্ছে- একটা অভাব যখন দূর হয় তখন আরেকটা অভাব চলে আসে। যেমন অনেক মানুষ মনে করে টাকা নাই হাতে, আহারে টাকা যদি থাকতো তাহলে আমি কত সুখি হতে পারতাম। কিন্তু কোন কোন দার্শিনক বলে একথা- টাকা নাই হাতে সমস্যা একটাই টাকা নাই কিন্তু টাকা হওয়ার পরে সমস্যা শুরু হয়ে যায় অনেক! অনেক বেশি অসুখের দেখা মিলে যখন টাকা হয়ে যায়। যখন খাবাৱ থাকেনা, পেটে ক্ষুধা থাকে তখন আমরা সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে খাবারের কথা ভাবি খাবার খবার খাবার। ক্ষুধার্ত ব্যক্তির রবীন্দ্রসংগীত মনে আসে না, তার মনে আসে না পিকাছুর ছবির কথা, ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মনে আসেনা রোমান্টিকতা, সে কখনো চায়না আহ্লাদ আনন্দ ফুর্তি। তার মনে আসে শুধু দুমুঠো খাবাৱ।

❝ক্ষুধার্ত শিশু চাইনা সরাজ চায় দুটো ভাত একটু নুন, বেলা বয়ে যায় খাইনি কো বাছা কচি পেটে তাহার জ্বলে আগুন।❞
 কিংবা আপনারা জানেন ক্ষুধার্তের রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, ক্ষুধা পেটে পদ্য রচনা হয়না। তার মানে অনেকেই মনে করে, পেটের সমস্যা মিটে গেলেই মানুষের সব সমস্যা দূর হয়ে গেল। এ কথাটি একেবারেই সঠিক বলে আমার মনে হয়না। কারণ পেটের সমস্যা মিটে গেলেই নতুন সমস্যার সূত্রপাত হয়। মানুষ তখন আরাম চায়, আয়েশ চায়, আভিজাত্য চায়, মানুষ তখন বিখ্যাত হতে চায়, মানুষ তখন নিজেকে নিজের জীবনকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধৱতে চায়। তার মানে হচ্ছে তার মাঝে বাসনার উদ্বেগ ঘটে। অনন্ত বাসনাৱ এসে তাৱ মধ্যে খেলা কৱতে শুৱু কৱে। আৱ বাসনা যতক্ষণ পর্যন্ত আসে তার মধ্যে তৃপ্তি আসে না-পরিতৃপ্তি আসেনা। থেকে যায় অভাব অনন্ত অভাব। 

মনের দিক থেকে ধনী কে? কিভাবে আপনি সুখি হবেন?

সুফি সাধক সৈয়দ ৱশিদ আহমেদ; তার একটা বাক্য হচ্ছে- 

 ❝কে ধনী? যে সন্তুষ্ট সেই ধনী, অসন্তুষ্ট কোটিপতিও একজন ভিক্ষুক❞

এটা সৈয়দ ৱশিদ আহমেদের একটি বিখ্যাত বাক্য। তিনি একজন দার্শিনক মানুষ ছিলেন, প্রায় শতাধিক বছরের বেশি তিনি বেঁচে ছিলেন। পাঠক সমাবেশ থেকেও তার বই বের হয়েছে। প্রফেসর হাৱুনুৱ ৱশিদ সম্পাদিত সংকলিত 'সংলাপ সমগ্র' আপনারা যারা সুফিসাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহ আছে আপনাদেরকে আমি বলবো সৈয়দ ৱশিদ আহমেদের 'সংলাপসমগ্র' সংগ্র করে পড়তে পারেন। ওখানে বাসনা কে ব্যাখা কৱা হয়েছে ইসলাম ধর্মের আলোকে সুফিবাদের আলোকে। কিন্তু আজকে আমি যে কথাটি বলতে চেষ্টা করছি, সুখ কখনো সম্ভব না কারণ বাসনার কখনো মৃত্যু হয়না। বাসনা কখনো সমাপ্ত হয়না। তার মানে কি অসুখী ই আমাদের কপালে আছে? তাও না! যখন একজন মানুষ সুখ এবং অসুখ কে সহজভাবে নিতে পারেন সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন, তিনি হচ্ছেন সন্তুষ্ট মানুষ এবং তিনি হচ্ছেন প্রশান্ত মানুষ। আমি সংঙ্গাটা আরেক বার দিই- যার জীবনে কোন দুঃখ নেই সব সময় তিনি আনন্দে থাকেন খুশিতে থাকেন। আমি এরকম মানুষেৱ দেখা পাইনি, আর এটা সম্ভবও না! হ্যাঁ, পাওয়া যায় যারা মস্তিষ্ক বিকৃত তারা সুখে থাকতে পারেন কিংবা যারা এক্সসাইটমেন্টবাদি-সব সময় এক্সসাইটমেন্ট থাকে তারা সুখে থাকতে পারেন। যারা বোধহীন; নির্বোধ ব্যক্তিরা সুখে থাকতে পারে। কিন্তু যখন পৃথিবীর গভীর গভীরতর সুখ, মানুষের গভীর গভীরতর সুখ! তখন আপনি কেমন করে সুখে থাকতে পারবেন? 

আমার সমন্ধে আমার অনেক বন্ধুর মনে অনেক ভুল ধারণা জন্ম নিতে পারে যে আমি মনে হয় বেশ সুখি মানুষ, বাহ্যিক দিক থেকে নিজেদের দূর্বল মনে কৱে আমার অনেক বন্ধু ই বলে আমি খুব সুখি। না বন্ধুরা--অসুখকেও আমি সহজভাবে গ্রহণ কৱাৱ চেষ্টা কৱি। আমার মনের ভেতৱে লুকায়িত সকল দুঃখ কষ্টকে চাপা দিয়ে তা হেসে উঠিয়ে দিই। আমার জীবনের দুঃখগুলো সুখ মনে করে সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করি। সচেতন আছি এ বিষয়টা নিয়ে। একারণে আমাকে সুখিৱ মত মনে হতে পাৱে। আসলে আমাৱ মধ্যেও কি কোন বাসনাৱ ঘাটতি আছে? কত বাসানার ঘাটতি আছে। অভাবহীন কেউই নই। কিন্তু প্রকাশ কৱিনা, কারণ দুঃখ বেদনা প্রকাশ যত বেশি হবে ততই দুঃখ কষ্ট বাড়বে।

সুখের দার্শনিক তত্ত্ব- সুখের গোপন রহস্য অনুসন্ধান

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেকে বলছে ---

❝ আমি বহু বাসনারে প্রাণপনে চাই বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।

 রবীন্দ্রনাথ যদি বহু বাসনারে চায় আর বঞ্চচনা এসে বাঁচিয়ে দেয় তাহলে আমরা কি ছাড়! অতএব আজকের আমার এই ব্লগপোস্ট লেখার দর্শন হচ্ছে-- ভালো মন্দ মিলে জীবন। জীবন মানে সংগ্রাম। সংগ্রাম কষ্টের কিন্তু ফলাফলটি মধুর। সুখ-দুঃখ দু'য়েই জীবন।

ৱাত মানে দিন-সূর্য্য মানে আমাবশ্যা। এক দৈত্যেতা; আপনার চীনের দর্শনেরর কাছে ফিরে আসেন। চীনা লাউসুৱ দিত্বীয় কবিতাটি যদি আপনি পড়েন--

❝লোকেরা যখন কোন কিছুতে সৌন্দর্য্য দেখে, অন্যকিছুকে তখন মনে হয় দারুণ কুৎসিত। লোকে যখন কোন কিছুকে ভালো বলে, অন্যকিছুকে তখন মন্দ বলে মনে হয়। থাকা না থাকা একে অন্যকে সৃষ্টি করে। জটিলতা আর সহজতা একে অপরকে সমর্থন করে। ই আর ঈ তে একে অপরকে চিহ্নিত করে। উচু এবং নিচু একে অপরকে নির্ভর করে। পূর্ব এবং পর একে অপরকে অনুসরণ করে।❞

তার মানে হচ্ছে যুগ্নবিপীরত্ব-- আছে এবং নেই। 'নেই' কথাটি শুনলেই কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে 'আছে' আবার আছে'র সাথে 'নেই'। রোগ এবং এর সাথে আরেকটি শব্দ চলে আসে উপসম। পৃথিবী আজ গভীর সংকটে নিপীতিত কিন্তু মনে রাখতে হবে সংকটের সাথে রয়েছে শুভ নিশ্চয়। সংকটের সাথেই আছে সফলতা।

পৃথিবী আজ গভীর সংকটে নিপীতিত কিন্তু মনে রাখতে হবে সংকটের সাথে রয়েছে শুভ নিশ্চয়। সংকটের সাথেই আছে সফলতা।

সুখ নিয়ে দার্শনিকদের চিন্তাধারা...

সুখ নিয়ে অনেকে দার্শনিকই  ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব দিয়েছেন। সুখ নিয়ে কিছু দার্শনিকদের চিন্তাধারা⤵️

  • ৪৫০ খ্রিষ্টপুর্বের দার্শনিক সক্রেটিস সুখের সম্পর্কে এভাবে বলেছেন- সুখের গোপন মন্ত্র হলো, খুব বেশি চাহিদা না রাখা, খুব বেশি না চাওয়া। এবং একই সঙ্গে আয়ত্ব করতে হবে বাসনা বা উপভোগ কমানোর। এছাড়া তিনি আরো মনে করেন সুখ কোন বাহ্যিক নয়, এটা নিজের আত্নীক বিষয়।
  • দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল এর চমৎকার একটি কথা হলো- "আমি আমার চাহিদাগুলো পূরণের পরিবর্তে তা কমাবার দ্বারা সুখ সন্ধানের পথ পেয়েছি"
  • এছাড়া চীনের শ্রেষ্ঠ্ দার্শনিক ছিলেন কনফুসিয়াস, যারা দর্শন সারা বিশ্বের ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনিও সুখ নিয়ে বলেছেন- "শুভ্র চিন্তা নিয়ে মানুষ যত বেশি ধ্যান-সাধনা করবে, তার বিশ্বজীবন ততটাই সুখমধুর হয়ে উঠবে"
  • চীনের আরেকজন দার্শনিক লাও জু'র চিন্তাধারায় সুখ মানে হলো (ভাবার্থ দিক থেকে)- ভবিষ্যৎ-অতীত বর্জন করে বর্তমানকে নিয়ে থাকুন। বর্তমানে যাহা কিছু রয়েছে তাহা নিয়েই ধ্যান-সাধন কুরুন, সুখের সন্ধান পাবেন।
  • আমেরিকার এক চিন্তাবিদ ম্যাসাচুসেটস-এর মতামত হলো অনুযায়ী-- সুখ অনেকটা প্রজাপতির মতো; এই প্রজাপতির পিছু পিছু যত ছুটবেন, এটা ততই আপনাকে ধোঁকা দিবে। কিন্তু এই ধোঁকা থেকে পরিত্রাণ পেতে আপনি যখন মনোযোগ অন্য কিছুতে দেবেন, তখন প্রজাপতি শান্ত হয়ে আপনার কাঁধে এসে বসবে। অনুরুপ ভাবে সুখের ব্যাপারটিও এরকমই! সুখের পিছু যত ছুটবেন, সুখ তত দূরে মনে হবে। যারা নিজের যা আছে তাই নিয়েই সন্তুষ্ট তারা সুখি। আপনি শান্ত হয়ে থাকুন দেখবেন আপনিই সুখি!!
তবে একটা চিন্তা মাথায় রাখবেন----
❝সুখ রহে না পথে পড়ে, সুখ নিতে হয় হাতে গড়ে!❞

উইকিপিডিয়ার তথ্য আলোকে- সুখ কি?

সুখ দর্শন HumanPhilo

Comments