নবী মুহাম্মদ সাঃ নূরের তৈরি নাকি মাটির তৈরি? এ বিষয়টি নিয়ে বহু মানুষের বহুবার আলোচনা-সমালোচনা, যুক্তি, তর্ক-বিতর্ক চলে গেছে। হয়েছে কত চুল ছেড়া বিচার বিশ্লেষণ, তবু কি হয়েছে সমাধান?
ব্যাখ্যা, আলোচনা, বিশ্লেষণ করেও একদল লোক মানতে রাজি নন- নবী মুহাম্মদ সাঃ মাটির তৈরি। তারা বলে থাকেন রাসুল মোহাম্মদ সাঃ নূরের তৈরি। আবার অন্যদল মানুষে মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন মুহাম্মদ সাঃ একজন মাটির মানুষ। মাটি থেকে উনি সৃষ্টি।
নবী মুহাম্মদ সাঃ নূরের তৈরি নাকি মাটির তৈরি?- এ নিয়ে কথার সুর উঠলে যেন তর্ক বিতর্ক শুরু হয়ে যায় শুরু, শুরু হয়ে যায় হৈ হুল্লোড়। আসলে নবী মুহাম্মদ কিসের তৈরি? মাটি নাকি নুর?
বিষয়টি এখন আমাদের ঈমান ও আমলের সাথে জড়িয়ে গেছে। নূর না মাটি-- এ বিষয়টির উপর এখন ঈমানের গতিপথ নির্ভর করছে। আজকের ব্লগপোস্ট- নবী মুহাম্মদ সাঃ নূরের তৈরি নাকি মাটির তৈরি? মাটির মানুষ নূর নবী মুহাম্মদ (সাঃ)।
বিষয় হচ্ছে মানুষ যতবারই তর্ক বির্তক করেছে আমার শুধু সেইখানে একটি প্রশ্নই থাকতো আর সেটি হল, আল্লাহ পাক কি আদম সন্তানকে কোথাও জিজ্ঞেস করবেন- রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিসের তৈরি ছিল? নাকি আমরা জিজ্ঞাসিত হব যে- আজ তোমায় আমার নিকট বলতে হবে আমি যে তোমাদের রাসূল পাঠিয়ে ছিলাম তা তিনি কিসের তৈরি ছিল?
বরং যে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হব সেইটা নিয়ে বিন্দু মাত্র চিন্তিত না। চিন্তিত না হওয়ার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে। আমাদের উপমহাদেশের এইসব মাজার পূজারি পীর পন্থী আলেম গুলো। এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, মাজার পুজারি বা মাজার ভক্তি আলেমদের কথা কেন এভাবে বললাম। আর কেনই বা তাদের কথা আসে তার কারণ--
রাসুল সাঃ নূরের তৈরী- এটা প্রমাণ করতে পারলে পীর ও মাজার পুঁজারীদের অনেক সুবিধা। তারা নায়েবে রাসুল সেজে নিজেদেরকে নূরের আসনে বসিয়ে কায়েমী ব্যবসা চাঙ্গা রাখতে পারে। অথচ আল্লাহ পাক কুরআনুল কারিমে অসংখ্য বার বলেছেন আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) অনুসরণ করার জন্য এবং কঠিন হুশিয়ারী দিয়েও বলেছেন- যেন আমরা রাসূলের সাঃ অনুসরণ করি এবং না করলে আমাদের আমল যত সুন্দরই হোক না কেন তা বাতিল হবেই। তারপর ও তাদের সেদিকে কোনো ব্রুক্ষেপই নেই!
নবী মুহাম্মাদ নুর নাকি মাটির তৈরি- এ নিয়ে বিতর্কের কারণ
রাসুল পাক সাঃ মাটির তৈরী, নাকি নূরের তৈরী -- এ বিতর্ক করেই কেটে গেল দেড় হাজার বছর। কিন্তু বিতর্কের যেন আর শেষ নেই। এ বিষয়ে আগেও যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে আলোচনা করেছেন একাধিক বার।
সুন্নী দাবীদার তরিকাপন্থী পীর ও আলেমগণ কুরআনের কিছু আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে জোর দাবী করেন যে, রাসুল সাঃ নূরের তৈরী। অপরদিকে সালাফী ঘরানার আলেমগণ কুরআন থেকে প্রমাণ উপস্থাপন করে দাবী করেন যে, রাসুল সাঃ মাটির তৈরী।
মহাযুক্তি- নবী মুহাম্মদ কি আদম সন্তান নন?
চলুন একটি সাধারণ একটি যুক্তির মাধ্যমে বোঝা যাক - নবী মুহাম্মাদ কিসের তৈরি, নুর নাকি মাটি? একটি ছোট বাচ্চাকেও যদি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া হয়- সমগ্র মানবজাতির আদি পিতা কে? বা পৃথিবীর প্রথম মানব আদম এবং হাওয়া যদি মাটির সৃষ্টি মানুষ হয়, তাহলে তাঁদের সন্তান-সন্ততি বা বংশধর কি মাটির ই হবে নাকি নুরের?
এই প্রশ্নটি করাও এক ধরণের বোকামির সামিল হওয়া। কারণ এর উত্তর একটি ছোট বাচ্চাও দিতে পারবে। প্রথমতঃ রাসুল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তিনি আমাদের আদি পিতা আদম আঃ এর বংশধর। আদম আঃ মাটির তৈরী। তা'হলে তার বংশধর নূরের তৈরী হয় কি করে? আদম শব্দের অর্থ কি? মানুষ শব্দের অর্থ কি? আপনাদের কাছে প্রশ্ন রইল আমার!
নবী মুহাম্মাদ নুরের সৃষ্টি, কুরআনে কি আছে?
নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) যে নুরের সৃষ্টি, কুরআনের কোন সুরার কোন আয়াতে আছে? মহাগ্রন্থ কুরআনের কোথাও বলা হয়নি যে, রাসুল পাক সাঃ নূরের তৈরী। বলা হয়েছে-
❝তিনি সিরাজাম মুনিরা ( জগতের উজ্জ্বল প্রদীপ)❞
— সুরাঃ আহযাব, আয়াতঃ ৪৫-৪৬
এখানে উজ্জ্বল প্রদীপ এর মানে তিনি বিশেষভাবে আলোকিত তথা হেদায়েত প্রাপ্ত মহামানব এবং হেদায়েতের বাণী নূরময় আল কুরআন তাঁর অন্তরে প্রোথিত। তিনি এই বাণী দিয়ে জগতের মানুষকে হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করার দায়িত্ব পেয়েছেন।
নবীর নুরের আলোকিত বিশ্ববাসী
সমগ্র পৃথিবী যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত পরস্পর মারামারি হানাহানি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এক গেত্র অন্য গেত্রের সাথে সামান্য তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে যুগের পর যুগ যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিত। এক আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহীদের শিক্ষাকে বাদ দিয়ে মূর্তিপুজা অগ্নিপুজা সহ গোটা জাতি শিরকের সাগরে নিমজ্জিত। এককথায় সমগ্র বিশ্ব তখন এর চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল ঠিক তেমনি এক সময়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সকল প্রকার অন্ধকারও জাহিলিয়াতের জাল ছিন্ন করে হেদায়েতের আলো ও শান্তির দূত করে এই পৃথিবীতে পাঠালেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে। আল্লাহ বলেন-
❝আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি❞
— সুরাঃ আল আম্বিয়া, আয়াতঃ ১০৮)
নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর আগমনে সমগ্র বিশ্ব হতে অন্ধকার চলে গেল, চলে গেল পরস্পর হানাহানি মারামারি অনাচার দুরাচার, যুগ যুগ ধরে চলে আসা সমস্ত কুসংস্কার ও মূর্তিপূজা অগ্নিপূজা সহ সমস্ত সিড়ি। প্রতিষ্ঠিা হলো তাওহীদ বা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের একত্ববাদ। তখন সমগ্র বিশ্বে নেমে এলো শান্তি অমীয় ধারা। গোটা আরব জুড়ে বিরাজ করলো শান্তি আর শান্তি। তাঁর প্রতিটি কথা ও কাজ গোটা পৃথিবীতে শান্তি ছড়িয়ে দিলো, মানুষ মনে প্রাণে বিশ্বাস করলো একমাত্র তাঁর অনুসরণ অনুকরণ এর মধ্যেই রয়েছে মানবজাতির মুক্তির একমাত্র পথ।
রাসূল (সাঃ) কিসের সৃষ্টি?- মাটি বনাম নূর
[৩৩: ৪৬] আয়াতে উল্লেখিত প্রদীপ দ্বারা অন্ধকার দূর হয়, অনুরূপ নবী (সাঃ) দ্বারা কুফর ও শিরকের অন্ধকার দূর হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানেও যে ব্যক্তি এ প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে পরিপূর্ণতা ও চিরসুখ লাভে ধন্য হতে চায়, সেও তা অর্জন করতে পারবে। কারণ তাঁর নবুঅতের এই প্রদীপ কিয়ামত পর্যন্ত দেদীপ্যমান থাকবে। তাই প্রতীকি অর্থে বলা হয়-- রাসুল সাঃ হলেন নূর তথা জগতের আলো। কিন্তু ভৌতগত ও জৈবগত উপাদানের দিক থেকে রাসুল পাক সাঃ নিঃসন্দেহে একজন আদম সন্তান এবং নিশ্চিতভাবে মাটির তৈরী সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং সকল সৃষ্টি জগতসমূহের মান্যবর।
কুরআনের আলোকে নূরতত্ত্বের জটিলতা খন্ডন
মূলত: আল্লাহ নূর বলেছেন কুরআনকে। যেমন--
❝ এমনিভাবে আমি আপনার কাছে এক ফেরেশতা প্রেরণ করেছি আমার আদেশক্রমে। আপনি জানতেন না, কিতাব কি এবং ঈমান কি ? কিন্তু আমি একে (কুরআনকে) করেছি নূর, যার দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করি। নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন।
-- অত্র আয়াতে কুরআনকে নূর বলা হয়েছে।
❝অতএব তোমরা আল্লাহ তাঁর রসূল এবং অবতীর্ন নূরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত।❞
— সূরাঃ আত-তাগাবুন [64:8]
-- অত্র আয়াতে অবতীর্ণ নূর বলতে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে।
❝যেসব লোক তাঁর উপর ঈমান এনেছে, তাঁর সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং সে নূরের অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধুমাত্র তারাই নিজেদের উদ্দেশ্য সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।❞
— সূরাঃ আল-আরাফ [7:157]
-- অত্র আয়াতে অবতীর্ণ নূর বলতে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে।
রাসূল (সাঃ) আদৌ নুরের তৈরি নন; তিনি মাটির মানুষ, আদম সন্তান
কিন্তু রাসুল পাক সাঃ নূরের তৈরী- কুরআনে এমন একটি আয়াতও নেই। রাসুল পাক সাঃ একজন মানব সন্তান, যাকে আল্লাহ রক্ত-মাংস, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, ঘুম, হাসি-কান্না, রাগ-ক্ষোভ, যৌন-চাহিদা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, অসুখ-বিসুখ ইত্যাদি ভৌত ও জৈবগত মানবীয় উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং জগতের রহমত হিসাবে ঘোষণা করেছেন, যার কাজ হল মানুষকে নূরময় বাণী তথা হেদায়েতের বাণী শোনানো। সেই হিসাবে রূপক অর্থে তিনি নূরের নবী- নূরনবী।
আসলে আল্লাহ নিজেকেই নূর বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন--
❝আল্লাহ হলেন ভূ-মন্ডল ও নবো-মন্ডলের জ্যোতি- নূর।❞
— আল কুরআন [২৪: ৩৫]
মাটির মানুষ নূর নবী মুহাম্মদ (সাঃ)
আর প্রতীকি অর্থে কুরআন ও রাসুল পাক সাঃ উভয়কে নূর তথা হেদায়েতের আলো বলেছেন। সমাজে নূরের দাবীদার কায়েমী ব্যবসায়ী আছে। তাই, এসব নিয়ে বিতর্ক থাকবেই। তবে ভ্রান্ত বিশ্বাস মানুষকে গোমরাহী পথে ঠেলে দেয়। তাই, বিশ্বাসকে কুরআন দিয়ে মজবুত করে নিতে হবে।
নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)- হিউম্যান ফিলো
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের মহামান্য মহামানব। সর্বশ্রেষ্ঠ নবি নবীকূলের শিরোমনি মুসলিম জাহানের নয়নমনি। সারাদুনিয়ার কুখ্যাত -বিখ্যাত- মান্য -গণ্য -জঘন্য -ধর্মীয়- অধর্মীয় -বিধর্মীয় সকল মানুষ যার চারিত্রিক নৈতিক গুনসম্পূর্ণ সদগুনের সত্যায়িত স্বীকারোক্তিত্ব সত্ত্যম ব্যক্তিত্ত্ব।
#muhammad #Islam #Quran #Human_Philosophy

Good Post
ReplyDelete