“চিন্তা এই শব্দটি শুনতেই মনে হয়, এ যেন আমাদের ভেতরের কোনো কণ্ঠস্বর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই কণ্ঠস্বরটি কার? কে আমাদের ভাবনায় কথা বলে? চেতনা, না মন? নাকি এর বাইরেও কোনো গভীরতর সত্তা আছে, যাকে আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি?।”
প্রতিদিন আমাদের মাথার ভেতর দিয়ে কত শত চিন্তা আসে। কিন্তু একটু থেমে ভাবুন, এই চিন্তাগুলো কি আপনি নিজে তৈরি করছেন? নাকি এই চিন্তাগুলো আপনার মন ই আপনাকে চিন্তা করাচ্ছে? আমরা কি স্বাধীনভাবে চিন্তা করি? আমাদের প্রতিদিনের চিন্তা কি সত্যিই আমাদের নিজের? নাকি মন-চেতনার গভীরে লুকিয়ে থাকা অসচেতন প্রভাব আমাদের চালায়? মন ও চেতনার দ্বন্দ্ব নিয়ে হিউম্যান ফিলোর ব্লগটি বাস্তব উদাহরণ, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, মনস্তত্ত্ব ও দর্শনের আলোকে তুলে ধরা হবে। চিন্তার এই অন্তর্জগৎ ও আত্মোপলব্ধির জগতে প্রবেশ করতে এই ব্লগটি পড়ুন--
মনে করুন- আহসান নামের একজন ছাত্র: যার আগামীকাল এইচএসসির পরীক্ষা। তার চেতনা তাকে বলতেছে-- এখনই পড়তে বসতে হবে, না হলে পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হবে। কিন্তু ঠিক সে সময় তার মন আবার তাকে বলতেছে-- আরে একটু ফেসবুক চালাই, একটু গেম খেলি। এখনো অনেক সময় আছে পড়ার। এই সংকটময় সময়ে আহসান মন ও চেতনার দ্বন্দ্বে আটকে যায়। এই দ্বন্দ্বে যদি মন জেতে, তাহলে আহসান হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করেই কাটিয়ে দেবে। কিন্তু যদি তার চেতনা জাগ্রত হয়, সে ফোন সরিয়ে বইয়ের পাতা খুলবে।
এখানে চিন্তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের মাথায় এরকম হাজারো চিন্তা আসে, এবং সে চিন্তার দ্বন্দ্বে পরে যায়। এই চিন্তার রহস্য কি? চিন্তা কেন? কীভাবে?আসে?
আমি যা ভাবি, তা কি আমি নিজেই ভাবছি?
একজন লোক সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে অকারণেই বিষণ্ণ বোধ করলো। অথচ কিছুই তো হয়নি! হঠাৎ মন খারাপ, একরাশ বিরক্তি, মনে অস্থিরতা-- এর পেছনে কারণ কী ? সে নিজেই জানে না! এই অনুভূতির উৎস আসলে কী?
আমাদের মাথায় এরকম বহু চিন্তা ভাবনা বা অনুভূতি সর্বদাই তাড়া করে। কিন্তু আমরাই চিন্তার উৎস সম্পর্কে জানার চেষ্টাও করি না। ধরুন ---
মাসুদ রানা একজন ভদ্র শিক্ষিত ও ধর্মপ্রাণ যুবক। সামনে তার একটি চাকরির ইন্টারভিউ আছে। এবং সে ইন্টারভিউ এর আগে জানতে পারল; সে যদি একটু কৌশল করে সাজিয়ে গুছিয়ে মিথ্যা বলে তাহলে সে চাকরিটা পেয়ে যাবে। তার মাথায় এখন একদিকে চাকরির লোভ এবং অন্যদিকে ভয় কাজ করছে। বসে বসে ভাবছে- যে কোন উপায়ে আমি যদি চাকরিটা পাই তাহলে আমার পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে পারবো। কিন্তু এই চাকরি পাবার জন্য আমাকে মিথ্যা বলতে হবে। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আমি কি তাহলে আমার মূল্যবোধ নষ্ট করবো বা সত্যকে ত্যাগ করে দিব? এখানে মাসুদের "মন" তাকে লোভের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে "চেতনা" তাকে নৈতিক মূল্যবোধ কে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে- সৃষ্টিকর্তা দেখছেন।! সর্বশেষে সে সিদ্ধান্ত নিল সত্য বলার এবং সে চাকরি পেল না।
এখানে কি বুঝতে পারলেন?-- মাসুদ প্রথমবার যে চিন্তা করেছিল, তা কি সে নিজেই চিন্তা করেছিল?? নাকি সে মনের ধোকায় পড়েছিল? এবং দ্বিতীয়বার যে চিন্তা করেছিলো, সে কে ছিল?? দ্বিতীয়বারের চিন্তাটি ছিল সত্য।। আর এই সত্যই আমি!!
মন বনাম চেতনা – মন ও চেতনার পার্থক্য?
কে চালায় আমাদের চিন্তা? মন, নাকি চেতনা?
আমরা কি সত্যিই ভাবি! মন ও চেতনার পার্থক্য-
মোশারফ একটা জরুরী কাজে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে সে একজন ক্ষুধার্ত বৃদ্ধকে দেখতে পেলো। সে দাঁড়ালো। তার মন বলছে- এখন সময় নেই, ক্লান্ত লাগছে, তাছাড়া আমাকে তাড়াতাড়ি জরুরী কাজে যেতে হবে। ঠিক একই মুহূর্তে তার চেতনা তাকে বলছে-- মানব সেবা উত্তম ধর্ম। অবশেষে মোশারফ বৃদ্ধ লোকটিকে পাশে থাকা দোকান থেকে খাবার কিনে দেয়। এখানে মন ও চেতনার দ্বন্দ্বে--- মন বলে চলে যেতে কিন্তু চেতনা তাকে দাঁড়াতে শেখায়।
এই গল্পটি থেকে আমরা বুঝতে পারি-- মন হচ্ছে আবেগ নির্ভর। চেতনা হচ্ছে সচেতন ও যুক্তি নির্ভর। মন ও চেতনার এই দ্বন্দ্বে যদি চেতনার প্রাধান্য থাকে তাহলে সিদ্ধান্ত হয় মর্যাদা সম্পন্ন, বিবেকবান! আর এই চেতনার হাত ধরেই আমরা সত্যকে খুঁজে পাই!! খুঁজে পাই নিজ সত্তাকে।
কুরআনের আলোকে মন ও চেতনার পার্থক্য?
ইসলামে মন (নফস) ও চেতনার (রুহ/আত্মা) স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কুরআন বলে---
“নফসকে পরিশুদ্ধ করাই সাফল্য। আর যে একে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ।”
— সূরা আশ-শামস: আয়াত ৯-১০
এখানে মনকে (নফস) কলুষিত করার কথা বলা হয়েছে। আর চেতনা (আত্মা, রুহ) দ্বারা নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে হবে; যা আল্লাহর কাছ থেকে আসে। কুরআন আমাদের বলে - চিন্তা, সিদ্ধান্ত, আবেগ সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে আল্লাহভীরু চেতনার মাধ্যমে।
আমরা যদি প্রতিটি চিন্তায়, কাজে, সিদ্ধান্তে চেতনাকে সক্রিয় না করি তাহলে মন অবচেতনভাবে আমাদের চিন্তা শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। একথা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন--
“ আল্লাহ মানুষের অন্তরকে ঘিরে রেখেছেন তাদের চেতনার চাইতেও বেশি।”
— সূরা ক্বাফ, ১৬
আল্লাহ জানেন, আমাদের মন কী চায়, আর আমরা কী ভাবি। অর্থাৎ, মন যা চায় তা নয়, চেতনা যা বোঝে, সেটিই বিচারযোগ্য। প্রতিদিন আমরা এই দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়েই যাই। মন খুঁজে কমফোর্ট, আর চেতনা খোঁজে সত্য!
মন ও চেতনা সম্পর্কে দার্শনিক মনস্তত্ত্ব
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় মানবচিন্তা কাজ করে দুটি সিস্টেমে। প্রথমটি হচ্ছে মন; যা দ্রুত আবেগ নির্ভর এবং স্বয়ংক্রিয়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে চেতনা; যা সচেতন এবং যুক্তি নির্ভর।
আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষক দের ধারণা মতে- মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ চিন্তা আসে অবচেতন মন থেকে। দার্শনিক ফ্রয়েড বলেছেন--
“মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয় ৯০% অবচেতন মন দ্বারা।”
— দার্শনিক ফ্রয়েড
অর্থাৎ আমাদের চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত, প্রতিক্রিয়া এমনকি রাগ, ভালোবাসা, ঘৃণা অনেকাংশেই নিজের দ্বারা সংগঠিত হয় না। মানব মস্তিষ্কে চেতনা যদি জাগ্রত না হয় তবে আমরা শুধু মনের দাস হয়ে থাকবো!! সুতরাং সব অবস্থায় আমাদের চেতনাকে জাগ্রত রাখতে হবে!🌿
আমরা কি আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি?
আমরা যদি নিজেকে প্রশ্ন করি- “আমি যা ভাবছি; তা কি আমি সত্যিই ভাবছি?” এই একটি প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় মন ও চেতনার বোঝাপড়া। এভাবে নিজেকে প্রশ্ন করে চেতনাকে জাগ্রত করে, শক্তিশালী করতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো। মনকে নিয়ন্ত্রণ করার কয়েকটি উপায় হচ্ছে-- নিজেকে নিয়ে চিন্তা করা। ধ্যান ও প্রার্থনা করা। ইচ্ছা শক্তিকে অটুট রাখা। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখা এবং সহজ জীবনযাপন করা।
আমাদের চিন্তাকে চালায় কে?
মন চায় নিরাপত্তা, লোভ, প্রতিশোধ। চেতনা চায় সত্য, নৈতিকতা, শান্তি। যদি চেতনা ঘুমিয়ে পড়ে, তবে মন আমাদের চালায়। আর যদি চেতনা জেগে ওঠে, তখন আমরা মনকে চালাতে পারি। অতএব, নিজেকে মন না ভেবে চেতনা হিসেবে চর্চা করা। সেটিই আত্মউন্নয়ন, সত্য চিন্তা ও আল্লাহর দিকে ফেরার পথ।
মন বলেছিল করো না, চেতনা বলেছিল করো। এই দ্বন্দ্ব চিরন্তন -- আমাদের মন সবসময় সহজ পথ খোঁজে, আর চেতনা খোঁজে অর্থপূর্ণ পথ। আপনি কোন পথ বেছে নিচ্ছেন?
আপনি কীভাবে আপনার চিন্তার উৎস নির্ণয় করেন? আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন কমেন্টে।

Comments
Post a Comment