জবাবঃ ধরা যাক যে আমরা এমন এক স্রষ্টাকে বেছে নিতে চাই যিনি আমাদের আস্তিকতা বা নাস্তিকতার দায়ভার আমাদের ওপর চাপাবেন না। ধরা যাক। তাহলে তার অর্থ এই দাড়াচ্ছে যে তিনি এমন এক স্রষ্টা যিনি সবকিছু আগে থেকে জানেন না। তাহলে তিনি স্রষ্টা নন।
কেবল তিনি ই স্রষ্টা হতে পারেন - বা, অন্য কথায়, কেবল সেই সত্তাকেই স্রষ্টা হিসেবে স্বীকার করা যায় যার কোনো দুর্বলতা বা অসম্পূর্ণতা নেই। সুতরাং স্রষ্টা হবেন এমন এক সত্তা যিনি সবকিছু আগে থেকেই জানেন। কিভাবে তা আমরা জানি না।
এখন, রহস্যটা হলো, তিনি তার জ্ঞান নামক বৈশিষ্ট্য দ্বারা সব ধারণ করে আছেন। কিন্তু কর্মের দায়ভার কর্মীর ওপরই বর্তায়। ফলে কেউ কেবল সেই কর্মেরই ফল প্রাপ্ত হবে যা সে করেছে।
স্রষ্টা কোনো কিছু জানেন বলেই যে তা ঘটে তা নয়। বরং কর্মী কী ঘটাবে তা তিনি জানেন। এবং কর্মের বিচার হয়ে গেলে তার ফল সৃষ্টি হওয়ার আগেই তা লিখিত হয়ে যায়। লিখন মানেই ভবিষ্যতের ঘটনার অগ্রিম পরিকল্পনা। অর্থাৎ ঘটনার আগেই তা জানা। আর, যা লিখিত হয়ে গেছে তা ঘটবেই। কারণ বাস্তবতার কাঠামো তৈরি হয় লিখন অনুযায়ী। ফলে যা ঘটার তা ঘটানো হবেই। এ কেউ আটকাতে পারবে না। অথচ কর্মী ছাড়া আর কেউই তার জন্য দায়ী নয়!
=================================
প্রথমত বলে রাখি - এই জাতীয় আলোচনা কেবল চিন্তাশীল বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের জন্য। তবে সচরাচর বিশ্বাসী ব্যক্তিগণ এই প্রশ্ন করবেন না। যদি করেন, তাহলে তা করবেন কেবল জ্ঞানের জন্য, "বিশ্বাস করব কি করব না" সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নয়।
বিশ্বাস দুর্বোধ্যতাকে গ্রহণ করতে সাহায্য করে। বরং বিশ্বাস মজবুত তথা ঘাতসহ না হলে এই জাতীয় আলোচনা কে কারো কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে।
পূর্বের লিখন নিয়ে কথা মানে সবকিছুর শুরুর বিন্দু নিয়ে কথা বলা। অর্থাৎ এই জাতীয় কথাই এক দৃষ্টি কোণ থেকে শেষ কথা। অর্থাৎ এই জাতীয় কথা পূর্ণাঙ্গ হওয়া পুরোপুরি অসম্ভব। তবে জ্ঞান প্রান্তে না পৌছালেও যুক্তি প্রান্তে পৌছায়। তাই এই আলোচনা আমরা করব। চিন্তাশীল বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী দের সাথে কথা বলার সময়ে বিষয় টা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ধরুন যে কোনো স্রষ্টা মহাবিশ্ব কে সৃষ্টি করেন নি। তা যে কোনো আনুমানিক ব্যাখ্যা (বা তত্ত্ব) অনুযায়ী বিবর্তিত হয়েছে। যা হোক, যে ভাবেই তা সৃষ্ট হোক না কেন, সৃষ্ট হওয়ার পরে তার এই চিত্রটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাহলে কি এই প্রশ্নটা আমরা করব - কর্মের দায়ভার কার ওপর? বা যা ঘটছে বা ঘটবে বা ঘটেছে তা আগে থেকে লিখিত কি না?
অবশ্যই জ্ঞানের জন্য তখনও তৃষ্ণার্তগণ প্রশ্ন করতেন। তবে আগে থেকে কোনো স্রষ্টার প্রসংগ উল্লেখিত হতো না বলে "মানুষের কী দোষ?" জাতীয় প্রশ্ন উচ্চারিত হতো না।
তখন যদি সবকিছুর পিছনে কনো স্রষ্টা আছেন কি না এই অনুসন্ধান চালানো হতো তাহলেও সেই অনুসন্ধান হতো সত্য উদঘাটনের অনুসন্ধান। এবং যদি সঠিক জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে জানা যেত যে সবকিছুই পূর্বনির্ধারিত অথচ কর্মের জন্য মানুষ ই দায়ী, তাহলে প্রশ্নটাই আর উচ্চারিত হতো না।
জ্ঞানের ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়ার কারণে, অর্থাৎ আগে উত্তর পাওয়ার কারণে, প্রশ্ন আর উচ্চারিত হতো না।
প্রথমে বুঝতে হবে যে সব কিছু আগে থেকে লিখিত এই কথা বলার অর্থ হলো তথ্য এবং সময় এর একটা বিশেষ সম্পর্ক কে সত্য হিসেবে ধরে নেয়া। সম্পর্ক টা হলো এই যে, তথ্য এবং সময় শুরুর বিন্দুতে এক সাথে মিলিত হয়ে আছে।
অর্থাৎ প্রশ্ন জাগে জ্ঞানের অনুপস্থিতির কারণে। জ্ঞানের মাধ্যমে যেহেতু প্রমাণ করা যাচ্ছে না সব ঘটনার তথ্য আগে থেকেই সঞ্চিত আছে কি না, সেহেতু তথ্য ও সময়ের এই সম্পর্ক (অর্থাৎ সময়ের পূর্ববর্তী কোনো বিন্দুতে আগে পরের সব ঘটনার তথ্য সংরক্ষিত আছে) সত্য, এই দাবি করা হলে, বিশ্বাসের ভিত্তিতে ছাড়া তা গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তথ্যকে গ্রহণ করতে হয় জ্ঞান দিয়ে। বিশ্বাস দিয়ে তা গ্রহণ করবে সেই ব্যক্তি যে তা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করবে। যা হোক, এই জাতীয় বিষয় এতই মৌলিক যে অল্প কথায় এই আলোচনা সফল হয়েছে ধরে নিলে বুঝে নিতে হয় যে দর্শনশাস্ত্র বা বিজ্ঞান পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেছে। কিন্তু তা হবার নয়।
তাহলে এই আলোচনা সফলভাবে চালিয়ে যাওয়ার উপায় কী?
হ্যা, উপায় আছে। আমরা প্রথমে সে পথ নির্মাণ করব। তবে তার আগে ছোট একটা প্রশ্নের অদৃশ্য একটা বৈশিষ্ট্যের প্রতি নজর দেয়া যাক।
ধরা যাক যে প্রশ্নটার উত্তর আমরা পাই নি। হয়তো অপেক্ষায় রয়েছি। কিন্তু তার আগে, যিনি উত্তর দেবেন, তিনি বললেন - মানুষের দোষ হোক বা না হোক, ধরা যাক দোষ কারো না কারো ওপর চাপানো যাবে। তাহলে কার দোষ?
দেখুন, যখনই আমরা বলব যে সবকিছু আগে থেকে নির্ধারিত, তখন নির্ধারণ কারীর ব্যাপারে আমরা প্রশ্ন করি - দোষ আপনার না হয়ে আমাদের হবে কেন?
তিনি যদি বলেন - আচ্ছা, দোষ আমার। কিন্তু অপরাধ করলে শাস্তি তোমাকেই পেতে হবে।
তখন আমরা কী বলব? তখন কি আমরা বলব - মানি না?
আচ্ছা, ধরা যাক আমরা বিদ্রোহ করলাম এবং তিনি আমাদের দাবি ই মেনে নিলেন।
এখন, আমরা তাকে না মানলেও, তার অস্তিত্বে বিশ্বাস কি করেছি?
যাকে কেউ অবিশ্বাস করে, যার অস্তিত্ব ই কেউ অস্বীকার করে, তাকে কি সে দোষারোপ করে?
যে আদৌ নেই, তার দোষ গুণ কোনোটাই কি কেউ খোঁজ?
এখন, যদি কাউকে দোষারোপ করা হয়, তাকে কি তার অস্তিত্ব অবিশ্বাস করে সে দোষারোপ করার কোনো অর্থ থাকে?
অর্থাৎ দোষারোপ যে করে সে তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে।
আচ্ছা, স্রষ্টা নামক সত্তাকে একবার বিশ্বাস করা হলে তাকে অমান্য করার সুযোগ থাকে কি?
স্রষ্টার অস্তিত্ব সত্য মেনে নিলে তাকে আর অমান্য করার ইচ্ছা জাগতে পারে কি?
স্রষ্টার অস্তিত্ব সত্য মেনে নিলে তার কোনো সিদ্ধান্ত কে আর অযৌক্তিক মনে করা যায় কি, আমি তার রহস্য বুঝি আর না বুঝি?
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, এমন ব্যক্তি এই জাতীয় প্রশ্ন করবেই না। এবং দেখা যাচ্ছে যে স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, এমন ব্যক্তিও এই জাতীয় প্রশ্ন করবেই না।
অথচ প্রশ্ন কিন্তু করাই হয়। এখন প্রশ্ন হলো - কেন তাহলে এই প্রশ্ন?
জ্ঞানের উদ্দ্যেশ্যে? যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে শুধু যুক্তি চর্চার মাধ্যমে সেই জ্ঞান লাভ হবে না। আমি বিশ্বাসের কথা বলছি না। যেহেতু বিশ্বাসীও এই প্রশ্ন করে, সেহেতু বিশ্বাসের প্রসংগ এখানে নতুন কোনো সম্ভাবনা তৈরি করবে না। বরং আমি বলছি যে যুক্তি চর্চা করতে হবে ধর্ম চর্চার সাথেই। এবং উপযুক্ত সংসর্গে।
আর যদি অবিশ্বাসীর পক্ষ থেকে এই প্রশ্ন করা হয়, তাহলে মনে রাখতে হবে যে যার অস্তিত্ব সত্য বলে ধরে নেয়া হচ্ছে কেবল তার ব্যাপারেই এই জাতীয় প্রশ্ন করা যায়। অন্যথায় এই জাতীয় প্রশ্ন করা হলেও, প্রশ্ন টা করার পর কেউ তার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করবে না। কারণ উত্তর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে। যা কেউ বিশ্বাস ই করে না, সে তার সাথে তার জ্ঞানকে সংশ্লিষ্ট করে না।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী উভয়ে এই প্রশ্নটা করে। এ এক আত্মবিরোধ! সুতরাং কেন এই আত্মবিরোধ যুক্তি ও মনের মৌলিক মিলনস্থলে চেতনার প্রাথমিক আচ্ছাদন হিসেবে বিরাজ করে, তা আগে জানা জরুরি।


Comments
Post a Comment